Smart Contract কী ? স্মার্ট কন্ট্রাক্ট কীভাবে কাজ করে?
বর্তমান সময়ে আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে প্রযুক্তি আমাদের প্রতিদিনের কাজগুলোকে সহজ থেকে সহজতর করে তুলছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তির কথা উঠলেই আমাদের মাথায় সবার আগে ক্রিপ্টোকারেন্সির নাম আসে। কিন্তু আপনি কি জানেন, ব্লকচেইন প্রযুক্তির অন্যতম একটি বৈপ্লবিক উদ্ভাবন হলো ‘স্মার্ট কন্ট্রাক্ট’ ( Smart Contract )? সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এমন একটি ডিজিটাল চুক্তি যা কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদিত হয়।
প্রথাগত চুক্তিতে যেমন উকিল, নোটারি বা কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়, স্মার্ট কন্ট্রাক্টে তার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি মূলত কম্পিউটারের একগুচ্ছ কোড, যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হওয়ার সাথে সাথে নিজে থেকেই কার্যকর হয়ে যায়। আপনি যদি ডিজিটাল অর্থনীতিতে নিজের জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে চান, তবে স্মার্ট কন্ট্রাক্টের খুঁটিনাটি বোঝা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই আর্টিকেলে আমরা ধাপে ধাপে জানব স্মার্ট কন্ট্রাক্ট আসলে কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে।
স্মার্ট কন্ট্রাক্টের ইতিহাস: নিক সাজবো থেকে ইথেরিয়াম পর্যন্ত
স্মার্ট কন্ট্রাক্টের ধারণাটি কিন্তু খুব নতুন নয়। ১৯৯৪ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং ক্রিপ্টোগ্রাফার নিক সাজবো (Nick Szabo) প্রথম এই ধারণাটি প্রবর্তন করেন। তিনি এটিকে একটি ডিজিটাল ভেন্ডিং মেশিনের সাথে তুলনা করেছিলেন। আপনি যেমন ভেন্ডিং মেশিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনাকে পছন্দের পানীয় বা স্ন্যাকস দিয়ে দেয় এবং এর জন্য কোনো মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন হয় না, স্মার্ট কন্ট্রাক্টও ঠিক তেমনি।
নিক সাজবো যখন এই ধারণা দিয়েছিলেন, তখন ব্লকচেইন প্রযুক্তির অস্তিত্ব ছিল না। ফলে তখন এটি বাস্তবে রূপদান করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০০৯ সালে বিটকয়েন আসার পর এবং বিশেষ করে ২০১৫ সালে ভাইটালিক বুটেরিন (Vitalik Buterin) যখন ইথেরিয়াম (Ethereum) নেটওয়ার্ক লঞ্চ করেন, তখন স্মার্ট কন্ট্রাক্ট তার পূর্ণতা পায়। বর্তমানে ইথেরিয়ামই হলো স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্যবহারের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম। তবে বর্তমানে কার্ডানো (Cardano), সোলানা (Solana) এবং পোলকাডটের মতো ব্লকচেইনগুলোও উন্নত স্মার্ট কন্ট্রাক্ট সুবিধা প্রদান করছে।
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট কীভাবে কাজ করে: সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট মূলত “If-Then” লজিকের ওপর ভিত্তি করে চলে। অর্থাৎ, “যদি (If) শর্ত পূরণ হয়, তবেই (Then) ফলাফল কার্যকর হবে।” এটি পুরোপুরি কোডিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। চলুন একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক।
ধরুন, আপনি অনলাইনে একটি ডিজিটাল আর্ট কিনবেন। প্রথাগত ব্যবস্থায় আপনি টাকা পাঠালেন কিন্তু বিক্রেতা আর্টটি দিল না—এমন ঝুঁকি থেকে যায়। স্মার্ট কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে শর্ত দেওয়া থাকবে: “যখন ক্রেতা নির্ধারিত পরিমাণ ইথার (ETH) পাঠাবেন, তখন আর্টটির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রেতার ওয়ালেটে চলে যাবে।”
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট পরিচালনার ধাপগুলো নিম্নরূপ:
১. শর্ত নির্ধারণ: প্রথমে চুক্তির শর্তগুলো কোডিংয়ের মাধ্যমে লেখা হয় এবং ব্লকচেইনে আপলোড করা হয়।
২. অপরিবর্তনীয় স্টোরেজ: একবার কোডটি ব্লকচেইনে চলে গেলে সেটি আর কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। এটি অত্যন্ত নিরাপদ।
৩. ইভেন্ট ট্রিগার: যখন চুক্তির শর্তগুলো (যেমন লেনদেন বা সময়) পূরণ হয়, তখন নেটওয়ার্কের কম্পিউটারগুলো বা নোডগুলো (Nodes) এটি যাচাই করে।
৪. স্বয়ংক্রিয় সম্পাদন: শর্ত মিলে গেলে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট নিজে থেকেই ট্রানজ্যাকশন সম্পন্ন করে এবং ফলাফল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পাঠিয়ে দেয়।
এখানে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে, শর্ত পূরণ না হলে আপনার টাকা কোথাও যাবে না এবং শর্ত পূরণ হলে বিক্রেতা টাকা পেতে বাধ্য।
প্রথাগত চুক্তি বনাম স্মার্ট কন্ট্রাক্ট: কেন আপনি স্মার্ট কন্ট্রাক্ট বেছে নেবেন?

আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে সাধারণ চুক্তিগুলো করি, তার সাথে স্মার্ট কন্ট্রাক্টের আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। নিচের টেবিলটি লক্ষ্য করলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন কেন স্মার্ট কন্ট্রাক্ট আধুনিক বিশ্বের জন্য বেশি কার্যকর।
প্রথাগত চুক্তি ও স্মার্ট কন্ট্রাক্টের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| বৈশিষ্ট্য | প্রথাগত চুক্তি (Traditional Contract) | স্মার্ট কন্ট্রাক্ট (Smart Contract) |
| মধ্যস্থতাকারী | ব্যাংক, উকিল বা নোটারি প্রয়োজন হয়। | কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। |
| সময় | প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কয়েক দিন বা সপ্তাহ লাগতে পারে। | কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়। |
| খরচ | উকিল ও সার্ভিস ফি বাবদ অনেক খরচ হয়। | খরচ অত্যন্ত সামান্য (শুধু নেটওয়ার্ক ফি)। |
| নির্ভরযোগ্যতা | মানুষের ভুলের সম্ভাবনা বা জালিয়াতির ভয় থাকে। | কোড দ্বারা চালিত, তাই জালিয়াতি করা প্রায় অসম্ভব। |
| প্রক্রিয়া | ম্যানুয়াল বা হাতে-কলমে কাজ করতে হয়। | সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয়। |
| সংশোধন | উভয় পক্ষের সম্মতিতে পরিবর্তন করা যায়। | একবার ব্লকচেইনে দিলে পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। |
এই টেবিলটি থেকে স্পষ্ট যে, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট শুধুমাত্র সময় ও অর্থই বাঁচায় না, বরং এটি লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি নতুন স্তরের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আপনি যখন একটি স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করেন, তখন আপনি সিস্টেমের ওপর ভরসা করতে পারেন, কোনো ব্যক্তির ওপর নয়।
স্মার্ট কন্ট্রাক্টের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যসমূহ
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট কেন এত শক্তিশালী, তা বুঝতে হলে আপনাকে এর মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে হবে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একে অনন্য করে তুলেছে:
১. অপরিবর্তনীয়তা (Immutability): স্মার্ট কন্ট্রাক্ট একবার ব্লকচেইনে রেকর্ড হয়ে গেলে সেটি আর ডিলিট বা এডিট করা যায় না। ফলে কেউ চাইলেও চুক্তির শর্ত বদলে দিয়ে আপনাকে ধোঁকা দিতে পারবে না।
২. বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization): এই চুক্তি কোনো একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে থাকে না। বরং ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের হাজার হাজার কম্পিউটারে এটি ছড়িয়ে থাকে। ফলে কোনো একজন হ্যাকারের পক্ষে পুরো সিস্টেম নষ্ট করা অসম্ভব।
৩. স্বচ্ছতা (Transparency): ব্লকচেইনে থাকা স্মার্ট কন্ট্রাক্টের কোড যে কেউ দেখতে পারে। এর ফলে লেনদেনে কোনো লুকোচুরি থাকে না।
৪. সঠিকতা (Accuracy): যেহেতু এখানে মানুষের হাতের ছোঁয়া নেই, তাই গাণিতিক বা তথ্যগত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কোড যেভাবে লেখা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই কাজ করবে।
আরও পড়ুনঃ Layer 2 ব্লকচেইন কী জিনিস? কেন এটি ব্যবহার করা জরুরি?
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্যবহারের বিস্ময়কর সুবিধাসমূহ
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট কেন প্রথাগত চুক্তির চেয়ে উন্নত, তা শুধু এর কাজের প্রক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায় না, বরং এর বহুমুখী সুবিধাগুলো আমাদের প্রাতিক এবং ব্যবসায়িক জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আপনি যদি একজন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী বা সাধারণ প্রযুক্তিপ্রেমী হন, তবে এই সুবিধাগুলো আপনার ডিজিটাল কার্যক্রমকে অনেক বেশি গতিশীল করতে পারে।
খরচ সাশ্রয় ও মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতি
প্রথাগত চুক্তিতে আপনি যখন কোনো বড় লেনদেন করেন, তখন আপনাকে ব্যাংক, আইনজীবী বা ব্রোকারকে মোটা অঙ্কের ফি দিতে হয়। অনেক সময় এই ফি মূল লেনদেনের একটি বড় অংশ দখল করে নেয়। স্মার্ট কন্ট্রাক্ট এই তৃতীয় পক্ষকে পুরোপুরি সরিয়ে দেয়। যেহেতু এটি একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার কোড, তাই এখানে কোনো অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জের প্রয়োজন হয় না। ফলে আপনার কষ্টার্জিত অর্থ সাশ্রয় হয় এবং আপনি সরাসরি অন্য পক্ষের সাথে লেনদেন করতে পারেন।
দ্রুততা ও সময় সাশ্রয়
একটি ব্যাংক লোন বা জমি কেনাবেচার চুক্তি সম্পন্ন হতে দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস সময় লেগে যেতে পারে। প্রচুর নথিপত্র সই করা এবং সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ক্লান্তিকর। কিন্তু স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ডিজিটাল কোডের মাধ্যমে কাজ করে বলে এটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফলাফল প্রদান করতে পারে। আপনি যখনই চুক্তির শর্ত পূরণ করবেন, সিস্টেমটি সাথে সাথে আপনার কাজ সম্পন্ন করে দেবে। এতে মূল্যবান সময় বেঁচে যায়।
নিরাপত্তা ও নির্ভুলতা
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্লকচেইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ প্রযুক্তি। এর ডেটা ক্রিপ্টোগ্রাফির মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে, যা হ্যাক করা বা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া, প্রথাগত চুক্তিতে মানুষের হাতে টাইপিং বা হিসাবের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু স্মার্ট কন্ট্রাক্টে কোড যেভাবে নির্দেশ দেয়, সেভাবেই কাজ করে। ফলে এখানে গাণিতিক ভুলের কোনো অবকাশ নেই।
ব্যাকআপ ও ডেটা স্টোরেজ
আপনার জরুরি চুক্তিনামাটি যদি হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু স্মার্ট কন্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে আপনার চুক্তির প্রতিলিপি ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের প্রতিটি কম্পিউটারে সংরক্ষিত থাকে। ফলে আপনার সমস্ত ডকুমেন্ট ডিজিটাল ফর্মে সুরক্ষিত থাকে এবং প্রয়োজনে যেকোনো সময় তা যাচাই করা যায়।
বিভিন্ন সেক্টরে স্মার্ট কন্ট্রাক্টের বাস্তব ব্যবহার

স্মার্ট কন্ট্রাক্ট এখন আর শুধু কল্পবিজ্ঞানের কোনো বিষয় নয়। বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সেক্টরে এর সফল প্রয়োগ শুরু হয়েছে। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, অনেক বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি এখন স্মার্ট কন্ট্রাক্টের ওপর নির্ভর করছে।
ডিসেন্ট্রালাইজড ফাইন্যান্স
বর্তমানে স্মার্ট কন্ট্রাক্টের সবচেয়ে বৈপ্লবিক ব্যবহার হচ্ছে ডিফাই বা বিকেন্দ্রীভূত অর্থব্যবস্থায়। আপনি কোনো ব্যাংকে না গিয়েই স্মার্ট কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আপনার ক্রিপ্টো কারেন্সি লোন নিতে পারেন বা অন্যকে লোন দিয়ে সুদ অর্জন করতে পারেন। ইউনিসওয়াপ (Uniswap) বা আভে (Aave)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো পুরোপুরি স্মার্ট কন্ট্রাক্ট দিয়ে পরিচালিত হয়। এখানে কোনো লোন অফিসার নেই, কোনো ব্যাংক নেই—সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়।
সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট
একটি পণ্য ফ্যাক্টরি থেকে আপনার হাতে আসা পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ পার করতে হয়। স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে প্রতিটি ধাপ ট্র্যাক করা সম্ভব। যখনই পণ্যটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছাবে, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হয়ে যাবে এবং পেমেন্ট রিলিজ করে দেবে। এটি জালিয়াতি রোধে এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে অত্যন্ত কার্যকর।
রিয়েল এস্টেট ও জমি কেনাবেচা
জমির মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে জমি কেনাবেচায় প্রচুর নথিপত্র এবং দালালদের উপদ্রব সহ্য করতে হয়। স্মার্ট কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে জমির মালিকানা ডিজিটাল টোকেনে (NFT) রূপান্তর করা যায়। যখনই ক্রেতা নির্ধারিত অর্থ পাঠাবেন, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট নিজে থেকেই মালিকানা পরিবর্তন করে দেবে। এটি দুর্নীতি কমানোর একটি সেরা উপায়।
ডিজিটাল ভোটিং সিস্টেম
ভবিষ্যতে নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি রোধে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট হতে পারে প্রধান হাতিয়ার। স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে এমন একটি ভোটিং সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব যা কেউ হ্যাক করতে পারবে না বা ভোট পরিবর্তন করতে পারবে না। প্রতিটি ভোট ব্লকচেইনে স্বচ্ছভাবে রেকর্ড হবে এবং ভোট গণনা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফলাফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশিত হবে।
Smart Contract এর সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
সবকিছুরই যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আপনাকে কিছু চ্যালেঞ্জ এবং ঝুঁকির কথা মাথায় রাখতে হবে। সচেতনতা ছাড়া কোনো প্রযুক্তিতেই পূর্ণ নিরাপত্তা পাওয়া সম্ভব নয়।
কোডিং বাগ বা ত্রুটি
Smart Contract মূলত মানুষের লেখা কোড দিয়ে চলে। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। যদি কোডিংয়ে কোনো ছোটখাটো ভুল বা ‘বাগ’ থেকে যায়, তবে হ্যাকাররা সেই সুযোগ নিতে পারে। ২০১৬ সালের বিখ্যাত ‘The DAO Hack’ এর একটি বড় উদাহরণ, যেখানে কোডের ভুলের কারণে কোটি কোটি ডলারের ইথার চুরি হয়েছিল। তাই স্মার্ট কন্ট্রাক্ট মেইননেটে লঞ্চ করার আগে কয়েক ধাপে অডিট করা অত্যন্ত জরুরি।
আইনি স্বীকৃতির অভাব
Smart Contract প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকলেও আইনিভাবে এটি এখনো অনেক দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। যদি কোনো চুক্তিতে সমস্যা দেখা দেয় বা শর্ত ভঙ্গ হয়, তবে আদালতে এর নিষ্পত্তি করা কিছুটা জটিল হতে পারে। তবে বর্তমানে অনেক দেশ স্মার্ট কন্ট্রাক্টকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার কাজ করছে।
ওরাকল সমস্যা (The Oracle Problem)
Smart Contract ব্লকচেইনের ভেতরের ডেটা নিয়ে খুব ভালো কাজ করতে পারে, কিন্তু এটি বাইরের জগতের খবর (যেমন: আজকের ফুটবল ম্যাচের ফলাফল বা শেয়ার বাজারের দাম) সরাসরি জানতে পারে না। বাইরের ডেটা ব্লকচেইনে আনার জন্য ‘ওরাকল’ (Oracle) নামক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। যদি ওরাকল ভুল তথ্য দেয়, তবে স্মার্ট কন্ট্রাক্টও ভুল সিদ্ধান্ত নেবে। এটি স্মার্ট কন্ট্রাক্টের একটি উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা।
স্মার্ট কন্ট্রাক্টের সম্ভাব্য ঝুঁকি একনজরে
| ঝুঁকি | বিবরণ | প্রভাব |
| কোডিং ভুল | প্রোগ্রামিংয়ে লজিক্যাল ত্রুটি। | অর্থ চুরির ঝুঁকি। |
| স্থায়িত্ব | একবার আপলোড করলে পরিবর্তন করা যায় না। | ভুল সংশোধনে জটিলতা। |
| ডেটা সোর্স | বাইরের তথ্যের ওপর নির্ভরতা (Oracle)। | ভুল তথ্যে ভুল ফলাফল। |
| নিয়ন্ত্রণ | আইনি কাঠামোর অভাব। | বিবাদে আইনি সুরক্ষার অভাব। |
উপসংহার
Smart Contract কেবল একটি আধুনিক প্রযুক্তি নয়, এটি আমাদের ডিজিটাল লেনদেনের সংস্কৃতিতে এক আমূল পরিবর্তন। আপনি যদি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে দেখবেন এটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে। আপনি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আপনার ঘর ভাড়া দেওয়া থেকে শুরু করে অফিসের বেতন প্রদান—সবকিছুই স্মার্ট কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে সম্পন্ন করবেন।
প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে বর্তমানে বিদ্যমান নিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোও ধীরে ধীরে কমে আসবে। ব্লকচেইন যত বেশি জনপ্রিয় হবে, স্মার্ট কন্ট্রাক্টের কার্যকারিতা তত বাড়বে। এটি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এবং মানুষের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করে।
স্মার্ট কন্ট্রাক্ট সম্পর্কে আপনার এই প্রাথমিক ধারণা আপনাকে বর্তমানের এই ডিজিটাল বিপ্লবে এগিয়ে রাখবে। প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট এবং ব্লকচেইন সম্পর্কে নিয়মিত পড়াশোনা রাখা আপনার জন্য একটি সেরা বিনিয়োগ হতে পারে।
আশা করি এই সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি আপনাকে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট কী এবং এটি আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে সম্পর্কে একটি বিস্তারিত এবং স্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছে। আপনি যদি ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ব্লকচেইন জগতে নিজেকে একজন অভিজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তবে স্মার্ট কন্ট্রাক্টের এই জ্ঞান আপনার চলার পথকে আরও সুগম করবে।

