বিটকয়েন কেন ২১ মিলিয়নের বেশি হবে না?
বিটকয়েন বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক অবিচ্ছেদ্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে প্রায়ই ডিজিটাল গোল্ড বা ডিজিটাল স্বর্ণের সাথে তুলনা করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগতে পারে কেন এর সরবরাহ সীমিত? কাগজের মুদ্রার মতো কেন এটি ইচ্ছামতো তৈরি করা যায় না? ২০০৯ সালে যখন সাতোশি নাকামোতো বিটকয়েন প্রবর্তন করেন তখন তিনি এর সফটওয়্যার কোডে একটি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সেটি হলো ২১ মিলিয়ন। এই সীমাটি বিটকয়েনকে সাধারণ মুদ্রার বিপরীতে একটি শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে আমরা দেখতে পাই যে মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই দুষ্প্রাপ্যতাই বিটকয়েনের মূল শক্তি। আজকের আলোচনায় আমরা বিস্তারিত জানব কেন এই সংখ্যাটি নির্ধারিত হয়েছে এবং কেন বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এটি শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয় বরং বিটকয়েনের পুরো অর্থনীতির ভিত্তি।
কেন ২১ মিলিয়ন? বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমার পেছনের গল্প
বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় বরং এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত গাণিতিক হিসেব। সাতোশি নাকামোতো যখন এই নেটওয়ার্ক তৈরি করেন তখন তিনি এমন একটি মেকানিজম তৈরি করেছিলেন যেখানে গড়ে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ব্লক তৈরি হয়। শুরুতে প্রতিটি ব্লকের জন্য রিওয়ার্ড বা পুরস্কার ছিল ৫০টি বিটকয়েন। কোডের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ২১০,০০০ ব্লক পর পর এই পুরস্কারের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে যায়। আপনি যদি এই জ্যামিতিক প্রগতি হিসেব করেন তবে দেখবেন যে সবশেষে বিটকয়েনের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২০,৯৯৯,৯৯৯.৯৭৬৯ ইউনিটে যা সহজভাবে ২১ মিলিয়ন হিসেবে পরিচিত। এই গাণিতিক সীমাবদ্ধতা বিটকয়েনকে একটি ডিফ্লেশনারি সম্পদে পরিণত করেছে। বিটকয়েনের সফটওয়্যার আর্কিটেকচার এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন এটি কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে। ফলে এই সুনির্দিষ্ট গাণিতিক কাঠামোর বাইরে নতুন কোনো বিটকয়েন তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ কোডের ভেতরেই রাখা হয়নি। এই প্রোগ্রামিং কোডই বিটকয়েনকে সাধারণ মুদ্রার চেয়ে ভিন্ন এবং মূল্যবান করে তুলেছে।
আরও পড়ুনঃ Phishing Attack কীভাবে Crypto User দের টার্গেট করে?
বিটকয়েন হালভিং: সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি
বিটকয়েন ইকোসিস্টেমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো হালভিং। এটি মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া যা নতুন বিটকয়েন বাজারে আসার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতি চার বছর পর পর মাইনারদের জন্য নির্ধারিত পুরস্কারের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে যায়। আমরা যদি বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে দেখি তবে ২০২৪ সালের সর্বশেষ হালভিং বিটকয়েনের দুষ্প্রাপ্যতাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে মাইনাররা প্রতিটি ব্লকের জন্য যে পরিমাণ রিওয়ার্ড পাচ্ছেন তা আগামী ২০২৮ সালের হালভিংয়ে আবার অর্ধেক হয়ে যাবে। এই চক্রটি ততক্ষণ চলতে থাকবে যতক্ষণ না মোট ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন খনি থেকে উত্তোলন বা মাইনিং করা শেষ হয়। বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা বজায় রাখার জন্য হালভিং হলো সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা কবজ। এটি কেবল সরবরাহ কমায় না বরং বাজারে বিটকয়েনের চাহিদার বিপরীতে যোগানকে সীমিত রেখে এর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিটকয়েন আগামী শত বছর ধরে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে এবং বাজারে নতুন মুদ্রার মুদ্রাস্ফীতি ঘটার কোনো সম্ভাবনা রাখবে না।
দুষ্প্রাপ্যতা বনাম মুদ্রাস্ফীতি: বিটকয়েন কেন অনন্য?
সাধারণ কাগুজে মুদ্রা বা ফিয়াট কারেন্সির সাথে বিটকয়েনের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো এর দুষ্প্রাপ্যতা। যেকোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে তাদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন করে মুদ্রা ছাপাতে পারে। কিন্তু বিটকয়েনের ক্ষেত্রে এমন কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই। যখনই বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ করা হয় তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে এবং সাধারণ মানুষের হাতে থাকা অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা থাকার কারণে এখানে ইচ্ছামতো নতুন বিটকয়েন তৈরি করার কোনো সুযোগ নেই। এই নির্দিষ্ট গাণিতিক সীমাবদ্ধতাই বিটকয়েনকে একটি আধুনিক মুদ্রাস্ফীতি প্রতিরোধী সম্পদে পরিণত করেছে। মানুষ যখন দেখছে যে সময়ের সাথে সাথে ডলার বা টাকার মান কমছে তখন তারা বিটকয়েনের মতো একটি সীমিত সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। স্বর্ণের মতো সীমিত হওয়ার কারণেই একে ডিজিটাল গোল্ড বলা হয়। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যটিই বিটকয়েনকে বর্তমান অস্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে যা দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ সংরক্ষণে সহায়তা করে।
এই সীমা কি বাড়ানো বা বদলানো সম্ভব?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে বিটকয়েন যেহেতু একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তাই এর কোড পরিবর্তন করে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব কি না। উত্তরটি হলো তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও কার্যত এটি প্রায় অসম্ভব। বিটকয়েন একটি ওপেন সোর্স প্রোটোকল যার মানে হলো এর কোড যে কেউ দেখতে বা পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন পুরো নেটওয়ার্কে কার্যকর করতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ নোড অপারেটর এবং মাইনারদের সম্মতি প্রয়োজন। যদি কেউ এককভাবে বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা কি পরিবর্তনযোগ্য এমন কোনো চেষ্টা করে তবে তাকে একটি হার্ড ফোর্ক বা নেটওয়ার্ক বিভাজনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর ফলে একটি নতুন কয়েন তৈরি হতে পারে কিন্তু মূল বিটকয়েন নেটওয়ার্ক তার আগের নিয়মেই বহাল থাকবে। নেটওয়ার্কের অংশগ্রহণকারীরা কখনোই এমন কোনো পরিবর্তন গ্রহণ করবেন না যা তাদের নিজেদের কাছে থাকা বিটকয়েনের মান কমিয়ে দেবে। তাই বিটকয়েনের কোড পরিবর্তন করে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে তা মূল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। বিটকয়েনের এই কারিগরি সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী।
নেটওয়ার্ক কনসেনসাস: কেন Miners নোড মালিকরা রাজি হবেন না?
বিটকয়েন নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা এবং নিয়মাবলি রক্ষায় মাইনার এবং নোড মালিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সরাসরি বিটকয়েনের দুষ্প্রাপ্যতার সাথে জড়িত। গেম থিওরির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে নেটওয়ার্কের কোনো সদস্যই এমন কোনো কাজ করবেন না যা তাদের লোকসানের কারণ হয়। বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা যদি কোনোভাবে বাড়ানো হয় তবে বাজারে বিটকয়েনের প্রাচুর্য তৈরি হবে এবং এর ফলে প্রতিটি বিটকয়েনের বাজারমূল্য নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। মাইনাররা যারা কোটি কোটি টাকা খরচ করে হার্ডওয়্যার এবং বিদ্যুৎ ব্যয় করছেন তারা কখনোই চাইবেন না তাদের অর্জিত পুরস্কারের মান কমে যাক। একইভাবে নোড পরিচালনাকারীরাও নেটওয়ার্কের অখণ্ডতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই পরিবর্তন মেনে না নেয় তবে নতুন কোনো নিয়ম কার্যকর করা সম্ভব নয়। এই বিকেন্দ্রীভূত ঐকমত্য বা কনসেনসাস মেকানিজমই বিটকয়েনকে কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে এবং এর মূল অর্থনৈতিক কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখে। এই সম্মিলিত স্বার্থই বিটকয়েনের সরবরাহ সীমা অপরিবর্তিত রাখার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।
আরও পড়ুনঃ ভবিষ্যতে Crypto ব্যবহার না জানলে কি পিছিয়ে পড়বে মানুষ?
২১ মিলিয়ন শেষ হয়ে গেলে কী হবে?
বিটকয়েন মাইনিংয়ের এই মহাযজ্ঞ একদিন শেষ হবে। হিসেব অনুযায়ী ২১৪০ সালের কাছাকাছি সময়ে সর্বশেষ বিটকয়েনটি মাইন করা হবে। তখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে নতুন কোনো কয়েন তৈরি না হলে মাইনাররা কেন নেটওয়ার্ক সচল রাখবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ট্রানজেকশন ফি বা লেনদেন মাশুলের মাঝে। বর্তমানে মাইনাররা ব্লক রিওয়ার্ড এবং ফি উভয়ই পায় কিন্তু তখন তাদের আয়ের একমাত্র উৎস হবে লেনদেন থেকে আসা ফি। বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা পূর্ণ হওয়ার পর নেটওয়ার্কটি একটি পূর্ণাঙ্গ ফি-ভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর হবে। ততদিনে বিটকয়েনের ব্যবহার এবং নেটওয়ার্কের আকার এতটাই বৃদ্ধি পাবে যে শুধুমাত্র লেনদেন ফি দিয়েই মাইনারদের খরচ মিটিয়ে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হবে। এটি নেটওয়ার্কের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে। অর্থাৎ নতুন কয়েন না আসলেও লেনদেনের প্রবাহ এবং নিরাপত্তার চাকা সচল থাকবে যা এই ডিজিটাল অর্থনীতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বিটকয়েনের সীমার সাথে সম্পৃক্ত কিছু ভুল ধারণা
বিটকয়েন এবং এর সরবরাহ সীমা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন যে বিটকয়েনের সংখ্যা ২১ মিলিয়ন হওয়ায় কেবল ২১ মিলিয়ন মানুষই এটি কিনতে পারবেন। এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা কারণ বিটকয়েনকে দশমিকের পর আট ঘর পর্যন্ত ভাগ করা যায় যাকে সাতোশি বলা হয়। ফলে কোটি কোটি মানুষ চাইলে ভগ্নাংশ হিসেবে বিটকয়েন মালিকানা পেতে পারেন। আবার অনেকে ভাবেন যে বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা পূর্ণ হয়ে গেলে নেটওয়ার্কটি বন্ধ হয়ে যাবে। এটিও সত্য নয় কারণ নেটওয়ার্ক সচল রাখার জন্য নতুন কয়েনের প্রয়োজন নেই বরং লেনদেনের তথ্য যাচাই করাই হলো মূল কাজ। এই ধরনের বিভ্রান্তিগুলো দূর করা জরুরি কারণ বিটকয়েনের প্রযুক্তিগত ভিত্তি অনেক বেশি গভীর এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক যা সবার জন্য উন্মুক্ত।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে বিটকয়েনের ২১ মিলিয়ন সরবরাহ সীমা কেবল একটি গাণিতিক সংখ্যা নয় বরং এটি একটি নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। এটি এমন একটি ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে যেখানে কোনো একক কর্তৃপক্ষ চাইলেই মুদ্রার মান কমিয়ে দিতে পারে না। বিটকয়েনের এই দুষ্প্রাপ্যতা এবং পরিবর্তনের অযোগ্য বৈশিষ্ট্যই একে বৈশ্বিক মানচিত্রে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি নির্ভরযোগ্য ভাণ্ডার যা সময়ের সাথে সাথে তার মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম। যদিও প্রযুক্তির পরিবর্তনশীলতা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে কিন্তু বিটকয়েনের মূল ভিত্তি অর্থাৎ এর সরবরাহ সীমার প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন বাড়ছে। আর্থিক স্বাধীনতা এবং সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিটকয়েনের এই সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাই হবে আগামী দিনের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এই গাণিতিক নিশ্চয়তাই বিটকয়েনকে ভবিষ্যতের আর্থিক বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দুতে বসিয়েছে।
